সিরিয়ার ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার কিছুটা স্বস্তি আনলেও তা দেশটির অর্থনীতির দ্রুত পুনরুদ্ধারের জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ, বিধ্বস্ত অবকাঠামো ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সব মিলিয়ে দেশটির অর্থনীতি এখনো পুনরুদ্ধারের প্রাথমিক ধাপে আছে। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগ টানতে ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক করতে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপক সংস্কার, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। খবর দ্য ন্যাশনাল।
২০১১ সালে শান্তিপূর্ণ এক প্রতিবাদ দমন থেকে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়। এরপর দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ, উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর উত্থান ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সিরিয়ার অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেয়। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত সিরিয়ার মোট ক্ষতির পরিমাণ ৯২ হাজার ৩০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। দেশটি পুনর্গঠনে প্রয়োজন হতে পারে আনুমানিক ২৫-৫০ হাজার কোটি ডলার।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য সফরকালে রিয়াদে সিরিয়ার নেতা আহমদ আল শারার সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের আগে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। এটিকে সিরিয়ার রাজনীতি ও অর্থনীতির জন্য সুখবর হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এতে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আরব দেশ, তুরস্ক ও চীন এমনকি কিছু মার্কিন কোম্পানিও আগ্রহ প্রকাশ করতে পারে। তবে প্রকৃত বিনিয়োগ নির্ভর করছে নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও আইনি কাঠামোর ওপর।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের সিরিয়া কনফ্লিক্ট রিসার্চ প্রোগ্রামের পরিচালক রিম তুরকমানি বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সিরিয়ান মুদ্রা কিছুটা স্বস্তি পাবে। তবে পূর্ণমাত্রায় অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে আইনের শাসন ও নিরাপত্তার ব্যাপক উন্নয়ন না ঘটলে শুধু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার যথেষ্ট নয়।’
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেমন আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও ইউরোপীয় উন্নয়ন ব্যাংক সিরিয়ায় তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে পারে। তার জন্য সিরিয়া সরকারকে সুসংহত সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট আহমাদ আল শারা নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন ও ক্ষমতার কাঠামোয় পরিবর্তন এনেছেন।
অর্থনীতিবিদ আহমাদ আসসিরি বলেন, ‘সিরিয়ার মুদ্রা কিছুটা শক্তিশালী হলেও টেকসই হবে কিনা তা অনিশ্চিত। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার আমদানি সহজ করবে, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে ও প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ কিছুটা স্থিতিশীল করতে পারবে।
তবে আর্থিক খাতে বড় বাধা হলো দেশটির অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা এখনো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী হিসেবে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার তালিকাভুক্ত রয়েছেন। ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের (এফএটিএফ) ধূসর তালিকায় রয়েছে সিরিয়া। এতে দেশটিতে বিদেশী ব্যাংকগুলোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
উড়োজাহাজ পরিবহন খাত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সবচেয়ে সরাসরি সুফল পেতে পারে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পুরনো ও যন্ত্রাংশ-সংকটাপন্ন বহর নিয়ে পরিচালিত সিরিয়ান এয়ারলাইনস এখন বৈধভাবে খুচরা যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করতে পারবে, নিরাপত্তা ও পরিচালনা সক্ষমতা বাড়বে। আন্তর্জাতিক রুট ও বিমানবন্দরের উন্নয়ন আবার শুরু হতে পারে।
প্রযুক্তি খাতও কিছুটা মুক্তি পাবে। নিষেধাজ্ঞার কারণে গুগলের মতো যে সেবা বন্ধ ছিল, সেগুলোর কিছু আবার চালু হতে পারে।
নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া সিরিয়াকে আবারো বৈশ্বিক বিনিয়োগের পরিসরে ফিরিয়ে এনেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব এরই মধ্যে সিরিয়ার পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। সিরিয়ার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরেই টিকে থাকার লড়াই করে যাচ্ছে। এ পরিবর্তন তাদের নতুন সুযোগ এনে দিতে পারে।
তবে এসব সম্ভাবনার বাস্তবায়ন একটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে বলে অভিমত বিশ্লেষকদের। তা হলো রাষ্ট্র কতটা দ্রুত নিরাপত্তা, শাসন ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে সংস্কার করতে পারে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার একটি দরজা খুলে দিয়েছে, কিন্তু সেখানে প্রবেশ করার জন্য এখন প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।